শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:৫৬ পূর্বাহ্ন

খাজনা আদায় শেষে ঘুড়ি ওড়াত মোগলরা

অনলাইন ডেক্স :
  • প্রকাশিত সময় : বুধবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২১
  • ১৬ পাঠক পড়েছে

সাকরাইন উৎসবের দারুণ সময়টি চলে এসেছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসবে ছেলে বুড়োর বাছবিচার নেই। সবাই সমান আনন্দ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবারও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এরই মাঝে পাড়ায়-মহল্লায় শুরু হয়ে গেছে হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। ঘুড়ি কেনা, ছোটাছুটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দিনে ঘুড়ি। পিঠাপুলির আয়োজন। সন্ধ্যা থেকে আতশবাজি। থাকবে সঙ্গীত ও নৃত্যায়োজনও।

সাকরাইনকে নাগরিক উৎসব মনে হলেও, এর সঙ্গে লোকঐতিহ্য ও উদ্যাপনের যোগ আছে। পৌষের শেষদিনে সাধারণত পৌষসংক্রান্তির আনুষ্ঠানিকতা চোখে পড়ে। গ্রামীণ জনপদে এ উপলক্ষে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। একই দিন অভিন্ন প্রেক্ষাপটে পুরান ঢাকায় আয়োজন করা হয় সাকরাইন উৎসবের।

যতদূর তথ্য- মোগল আমলে ঢাকার নবাবরা এ উৎসবের সূচনা করেন। পৌষের শেষ এবং মাঘের শুরুর ক্ষণে খাজনা আদায় শেষে নবাবরা ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব করতেন। সেই ঐতিহ্য মেনে এখন পুরান ঢাকায় ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্রায় প্রতিটি বাসাবাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। ওপরের দিকে তাকালে ঘুড়ি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। অবশ্য ওড়ানোই শেষ কথা নয়, চলে কাটাকাটি খেলা। এ খেলায় আনন্দ বেশি। উত্তেজনায় ভরপুর। অন্যেরটা কাটা পড়লে উচ্ছ্বাস ধ্বনি। আনন্দ। আর নিজেরটার বেলায় ‘ইশ’! মন খারাপ। সকাল থেকে শুরু হওয়া ঘুড়ি উৎসব চলে বিকেল পর্যন্ত। সন্ধ্যার পর আরেক রূপ চোখে পড়ে। বাসাবাড়ির ছাদ থেকে শুরু হয় আতশবাজি। আলোর খেলায় মাতে সবাই। সেই সঙ্গে চলে খাওয়া-দাওয়া। পিঠাপুলিসহ সুস্বাদু রান্নার আয়োজন চলে।

এবার করোনাকাল। একটু বৈরী সময়। তবে প্রস্তুতিতে এর খুব প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না। সাকরাইনের প্রস্তুতি বিশেষ করে চোখে পড়ে শাঁখারীবাজারে। কারণ এখানেই পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি। সংগ্রহ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা ছুটে আসেন। গত কিছুদিন ধরে এ আসা-যাওয়া বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছোট গলিতে বহু দোকান। অধিকাংশ দোকানেই মাঙ্গলিক পণ্যের পসরা। তবে মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ঘুড়ি। দোকানের সামনের অংশ নানা রঙের ঘুড়ি দিয়ে সাজানো। গলির মাঝখানে বিশেষ কৌশলে বিশালাকার ঘুড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেখে, সে আপনি যত বড়ই হোন না কেন, মন আনন্দে নেচে উঠবে। কিশোরেরা তরুণেরা দলবেঁধে ছুটে আসছে। দামদর করে ঘুড়ি-সুতো আর নাটাই কিনে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে ওড়ানোর।

মা তারা শঙ্খ বিতান নামের একটি দোকান ঘুড়িতে ঠাসা। দোকানের মূল ব্যক্তি অমর সুর বলছিলেন, সারা বছর আমরা পুজোর সামগ্রী বিক্রি করি। সাকরাইনে সবাই ঘুড়ি চায়। তাই ঘুড়ি রাখি। এরই মাঝে কয়েক দফা নতুন ঘুড়ি এনে বিক্রিও করে ফেলেছেন বলে জানান তিনি।

স্বপ্নচূড়া নামের আরেকটি দোকানে ক্রেতার ভিড় এত যে, ঢোকা মুশকিল হয়ে যায়। দোকানি সুদেব সুর জানান, করোনা শুরুর পর থেকে এমনিতেই ঘুড়ির চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। এখন সামনে সাকরাইন। ঘুড়ির চাহিদা তুঙ্গে। নদীর ওই পার, মানে কেরানীগঞ্জ থেকে ঘুড়ি আনা হচ্ছে। পৌঁছে যাচ্ছে গোটা শহরেই।

এদিন ঘুড়ি কিনতে শাঁখারীবাজারে এসেছিল তন্ময় নামের এক কিশোর। কথা শুনে বোঝা গেল, ঘুড়ি পছন্দের ব্যাপারে ভাল অভিজ্ঞতা আছে তার। কোন্ ঘুড়িটি স্বাচ্ছন্দ্যে উড়বে সেটি নানাভাবে পরীক্ষা করে কিনতে দেখা যায় তাকে। ফেরার পথে সে বলছিল, ঘুড়ি হয়েছে। তবে ধারালো সুতোও চাই। কাটাকাটি খেলব। এ জন্য কাঁচের গুঁড়ো মেশানো সুতো দরকার বলে জানায় সে।

এদিকে, এবারই প্রথম সাকরাইন উৎসব উদ্যাপনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে ‘এসো ওড়াই ঘুড়ি, ঐতিহ্য লালন করি’ সেøাগানে বিশাল উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭৫ ওয়ার্ডে এ উৎসব আয়োজন করা হবে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত।

আরও দারুণ এক খবর দিয়ে ফজলে নূর তাপস বলেছেন, কাউন্সিলরদের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ঘুড়ি আগ্রহীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। পূর্ব নির্ধারিত মাঠ কিংবা বাড়ির ছাদে অবস্থান নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে পারবেন তারা।

সাকরাইন উৎসব-১৪২৭ আয়োজন প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ঐতিহ্যের সুন্দর, সচল, সুশাসিত ও উন্নত ঢাকা গড়ে তোলার যে রূপরেখা মেয়র ঘোষণা করেছেন, তারই আলোকে এবার পৌষসংক্রান্তিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন প্রথমবারের মতো কর্পোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে সমন্বিতভাবে পৌষ সাকরাইন তথা ঘুড়ি উৎসব আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ আয়োজন পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এসবের বাইরে ঘরে ঘরে চলছে পিঠাপুলির আয়োজন। মজার মজার রান্না হবে। বাজার করা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। আপনিও কি পেয়েছেন এমন আমন্ত্রণ? তাহলে একদম মিস করবেন না। সাকরাইন মিস করার মতো উৎসবটি নয় কিন্তু!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580