মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

জনগণের প্রত্যাশার উপর নির্ভর করে রাজনীতি করতে হবে বঙ্গবন্ধু

অনলাইন ডেক্স :
  • প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪ পাঠক পড়েছে

পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর, প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জার নামে। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর লে. জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। পরদিন তিনি প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জাকে সরিয়ে নিজেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন। জারি করেন মার্শাল ল’। তারপর ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এদেশে রাজনীতির নামগন্ধ ছিল না। রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন হয় কারাগারে নয়ত ফেরারি। সেনাবাহিনীর উপর ভর করে চলতে থাকে আমলাদের রাজত্ব।
জেনারেল আইয়ুব চালু করেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি গ্রেফতার করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। তাঁকে গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদ ও ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয়। আইয়ুবের ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র তত্ত্ব অনুযায়ী পাকিস্তানের দুই অংশের ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীদের ভোটেই জাতীয়, প্রাদেশিক ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিধান তৈরি হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের ৪০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের। এ দুই নির্বাচন সহজে পার হয়ে গেলেও আইয়ুব খান বুঝতে পেরেছিলেন, পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সচেতন মানুষকে দমিয়ে রাখা যাবে না।
সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তারের পরই তিনি টের পেয়েছিলেন, যত দমননীতিই চালানো হোক না কেন দেশ থেকে রাজনীতি একেবারে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। তাই তিনি ঢাকায় নিজের সমর্থনে কয়েকটি সমিতি গঠন করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ১৯৬২ সালের ৮ এপ্রিল গঠিত হয় ‘পিপলস ডেমোক্র্যাটিক গ্রুপ’। ওই বছরের মধ্যভাগ থেকে আইয়ুব খান নিজেই রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার খায়েশ জানান দিচ্ছিলেন। তাই ক্ষেত্রবিশেষে যৎকিঞ্চিৎ উদার হচ্ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই নিজ গরজেই তুলে নেন মার্শাল ল’।
ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া এবং অন্যান্য রাজনীতিকেরা ঘরোয়া আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য দলের নয়জন নেতা প্রকাশ করেন আইয়ুবের সংবিধানবিরোধী এক ঐতিহাসিক বিবৃতি। এই বিবৃতি ‘নয় নেতার বিবৃতি’ নামে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এঁরা হলেন, (১) শেখ মুজিবুর রহমান, (২) আতাউর রহমান খান (৩) নুরুল আমিন (৪) হামিদুল হক চৌধুরী (৫) সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া (৬) পীর মোহসীন উদ্দীন (৭) মাহমুদ আলী (৮) ইউসুফ আলী চৌধুরী (৯) আবু হোসেন সরকার। আইয়ুব খান মার্শাল ল’ তুলে নেয়ার পরদিন ৮ জুলাই এই নয় নেতা পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করেন। প্রায় চার বছর পর আইয়ুববিরোধী প্রকাশ্য জনসভা ছিল এটি। ১৪ জুলাই আইয়ুব খান রাজনৈতিক দলবিধি ঘোষণা করেন। দলবিধির আওতায় পূর্ব পাকিস্তানে দল গঠনের জল্পনা শুরু হয়।
১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট জেল থেকে মুক্তি পান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি মুক্তি পেয়েই পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। সমর্থন করেন ৯ নেতার বিবৃতি। তাঁর পরামর্শ ও উদ্যোগে ৯ নেতার সমন্বয়ে গঠিত হয় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)। আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিএফ ঘোষণা করা না হলেও ১৯৬২ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক ঐতিহাসিক সভায় এনডিএফ’র আদর্শ ও উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দীর বিশ্বাস অটুট ছিল যে, আইয়ুবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে। দলবিধির ফাঁদে পড়ে দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করলে তা হবে ঐতিহাসিক ভুল।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক শিষ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের মত ছিল. এককভাবেই আইয়ুবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কৌশল গ্রহণ করলে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হবে, শক্তিশালী হবে। এই পথেই জনপ্রিয়তা অর্জন সম্ভব। তাছাড়া কোনো দলের সাথেই কোনো দলের আদর্শগত মিল নেই। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর অটল সিদ্ধান্তের ফলেই টিকে যায় এনডিএফ।
কারামুক্তির পর জনমত গঠনে দেশব্যাপী রাজনৈতিক সফর ও অত্যাধিক পরিশ্রমের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েন সোহরাওয়ার্দী। ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে তাঁকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় তাঁর সঙ্গে পরামর্শের জন্য লন্ডনে যান শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের একটি হোটেলের কক্ষে খুবই রহস্যজনকভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু ঘটে। আঙ্গুল ওঠে আইয়ুবের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দিকে। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর এনডিএফ’র মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এনডিএফ ছেড়ে বেরিয়ে এসে পুনর্গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), নেজামে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী।
১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে (সড়ক ৩২, বাড়ি ৬৭৭) আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ওই দিন আওয়ামী লীগের মহকুমা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় সম্বলিত প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়কালে সত্যিকার অর্থে এ জনপদের রাজনীতিকেরা ছিলেন চাপের মুখে। স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু। কথায় কথায় হুলিয়া, গ্রেফতার, জেল। সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ তৎপর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কলহ-কোন্দল সৃষ্টির কাজে। এমন অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ উঠে আসে সামনের কাতারে। ঘোষণা করা হয় ১১ দফা।
আওয়ামী লীগের ১১ দফা:
১. ‘ফেডারেশন অব পাকিস্তান’ নামে সত্যিকার অর্থে ফেডারেল পদ্ধতি প্রণয়ন।
২. বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র কায়েম ও যুক্তনির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন।
৩. কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সামরিক বাহিনীসহ সকল সরকারি উচ্চপদে মেধা অনুসারে বাঙালিদের নিয়োগ।
৪. পাকিস্তানের উভয় অংশে বৃহৎ শিল্প কারখানা জাতীয়করণ।
৫. মোহাজেরদের জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রণয়ন।
৬. ফেডারেশনে বিভিন্ন জাতিভিত্তিক কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ভাষার
বিকাশ সাধনে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি প্রণয়ন।
৭. পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কায়েমের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক পৃথক মুদ্র্ ব্যবস্থাসহ পৃথক অর্থনীতি প্রণয়ন।
৮. পূর্ব পাকিস্তানসহ পাকিস্তানের সকল প্রদেশের জন্য পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন।
৯. বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব নিকাশ ও আয় ব্যয়ের পূর্ণ অধিকার প্রদেশের হাতে ন্যস্তকরণ।
১০. পূর্ব পাকিস্তানে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠাসহ দেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন।
১১. ছাত্রদের দাবি দাওয়াসহ শ্রমিক কৃষকের ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণ।
১৯৬৪ সালের ৫ জুন দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এই ১১ দফা অনুমোদনের জন্য পেশ করেন। এ নিয়ে কমিটিতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকে এই ১১ দফাকে দুঃসাহসিক মন্তব্য করে বলেন, আইয়ুব-মোনেম এটা সহ্য করবে না। ওয়ার্কিং কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দীর্ঘ ভাষণে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছাকাছি থাকতে হলে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়েই থাকতে হবে। পরিস্থিতি বুঝতে হবে। জনগণের প্রত্যাশার উপর নির্ভর করে রাজনীতি করতে হবে। নিজস্ব মতবাদ-আবেগ চলবে না। অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য লড়াই অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।’
প্রায় তিন ঘন্টা বাকবিতণ্ডার পর ওয়ার্কিং কমিটি ১১ দফা অনুমোদন করে। একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল আইয়ুবের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে দফা আকারে তা প্রকাশ করেনি। এ সম্পর্কে দি পাকিস্তান অবজারভার-এ লেখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580