রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

নিষ্প্রাণ ক্যাম্পাসে পরিযায়ী পাখির ওড়াউড়ি, ডানা ঝাপটানোর শব্দ

অনলাইন ডেক্স :
  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০
  • ২ পাঠক পড়েছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এমনিতেই অপরূপ। নৈসর্গিক এই সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে পরিযায়ী পাখির ওড়াউড়ি। না, এখনও শীতের দেখা মেলেনি। হালকা ঠাণ্ডা। এর মাঝেই ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করেছে পাখি। সুদূরের দেশ থেকে আসা পাখির কলাকাকলিতে মুখরিত এখন ক্যাম্পাস।

বর্তমান করোনা পরস্থিতির কারণে প্রায় সাত মাস ধরে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী শূন্য ক্যাম্পাসে ভরপুর প্রাণ এই পাখিরা। নানা নামের হরেক জাতপাতের পাখি পরিবেশটাকে আরও বেশি নিজেদের করে নিয়েছে। ক্যাম্পাসের জলাশয়ে ভিড় জমাতে শুরু করেছে তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিস সংলগ্ন লেকটাতেই এ বছর তুলনামূলক বেশি পাখি দেখা যাচ্ছে। পাখি দেখতে গিয়ে কথা হয় প্রকৌশল অফিসের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম মোঃ শরীফের সঙ্গে। তার অফিসের জানালা দিয়েই দেখা যায় পাখিদের ওড়াউড়ি এবং জলকেলির দৃশ্য। এছাড়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির কলকাকলি তো আছেই। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে ওড়ে আসা পাখিরা আমাদের অতিথি। শিক্ষার্থীরা না থাকলেও জাহাঙ্গীরনগরের প্রকৃতি পরিবেশ তাদের বরণ করে নিয়েছে। আমরা একটি অভয়ারণ্য সৃষ্টি করতে পেরেছি বলেই প্রতি বছর এ অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন সবাই। সারাদিন কাজের ফাঁকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয় এই পাখিরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হিসাব বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১২টি জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয়, পরিবহন অফিস ও প্রকৌশল অফিস সংলগ্ন জলাশয়, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের ভেতরের জলাশয় এবং সুইমিংপুল এলাকার জলাশয়ে অতিথি পাখির আধিক্য দেখা যাচ্ছে। জলাশয়গুলো বরবারের মতোই পাখির জন্য উন্মুক্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, জাবির জলাশয়গুলোতে সর্বপ্রথম পরিযায়ী পাখি আসতে শুরু করে ১৯৮৬ সালে। তখন ক্যাম্পাসে লেঞ্জা হাঁস, গার্গেনি, সরালিসহ ৪ থেকে ৫ প্রজাতির পাখির দেখা মিলত। পরে ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির পাখি এলেও গত কয়েক বছর থেকে এটা কমতে শুরু করেছে।

এ বছর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিং পুল সংলগ্ন লেকটিতে প্রথম দেখা গিয়েছিল ছোট সরালি। তারপর একে একে আসতে শুরু করেছে অন্য প্রজাতিরা পাখিরা। ছোট সরালি, বড় সরালি, গার্গেনি, খুন্তে হাঁস এবং আফ্রিকান কোম্বডাক এই পাঁচ প্রজাতির পাখি এখন পর্যন্ত জাবির জলাশয়গুলোতে দেখা গিয়েছে বলে জানান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ কামরুল হাসান।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার পাখি এসেছে। তবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পাখি আসে। সে হিসেবে আরও কিছু প্রজাতির পাখি আসতে পারে। সাধারণত হিমালয়ের উত্তরের দেশ সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া ও নোপালে এ সময়টায় প্রচুর তুষারপাত হয় এবং তীব্র খাদ্যাভাব সৃষ্টি হয়। যে কারণে পাখিরা মানিয়ে নিতে না পেরে বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। এ সময় অতিথি পাখি ক্যাম্পাসে আসার প্রধান কারণ হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে এ সময় প্রচুর পরিমাণে অতিথি পাখি হাওড় অঞ্চলগুলোতে আসতে থাকে। হাওড় অঞ্চলে পাখি শিকার হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে পাখিরা। তাই খাবার ও নিরাপত্তার কারণে পাখিগুলো শীতের শুরুতেই আমাদের ক্যাম্পাসে আসতে থাকে।

প্রতিবছর জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে পাখি মেলার আয়োজন করা হয়। করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ বছরেও পাখি মেলার আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মূলত দুই ধরনের পাখির আগমন ঘটে এ ক্যাম্পাসে। এক ধরনের পাখি ডাঙ্গায় বা শুকনো স্থানে বা ডালে বসে থাকে ও বিশ্রাম নেয়। আরেক ধরনের পাখি পানিতে থাকে। এদের বেশিরভাগই হাঁসজাতীয় ও পানিতে বসবাস করে। এরাই সবার নজর কাড়ে। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, কোম্বডাক, পাতারি হাঁস, জলকুক্কুট, খয়রা ও কামপাখি অন্যতম। এছাড়া মানিকজোড়, কলাই, ছোট নগ, জলপিপি, নাকতা, খঞ্জনা চিতাটুপি, লাল গুড়গুটি, বামুনিয়া হাঁস, নর্দানপিনটেল ও কাস্তে চাড়া প্রভৃতি পাখিও আসে এই ক্যাম্পাসে।

পরিযায়ী পাখি আসার খবরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পাখির বিচরণ উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে টানানো হয় জনসচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড। জলশয়গুলোকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে নেয়া হয়। এবার জনশূন্য ক্যাম্পাস। তাই এখনও তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আঃ রহমান বলেন, ক্যাম্পাস নীরব থাকায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি পরিমাণে পাখি এসেছে। পাখিদের আবাসস্থল উপযুক্ত করতে ইতোমধ্যে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। তবে দর্শনার্থী না থাকায় ওদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। এরপরও শীঘ্রই জনসচেতনতামূলক নির্দেশিকা টানিয়ে দেয়া হবে। আরও যা যা দরকার, করব আমরা।

তবে মনের আনন্দে পাখি দেখার অনুকূল পরিবেশ কবে ফিরবে, সে কথা জানা নেই কারও। বরং কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় অনেক কিছুই নতুন করে গুটিয়ে নেয়া হচ্ছে। তাই বলে পাখির থেমে নেই। বরং ডানা ঝাপটানোর শব্দে ক্যাম্পাসের বন্ধুদের ডাকছে তারা। পাখি এবং পাখিপ্রেমীদের সুহৃদ সমাবেশ দেখার অপেক্ষা করে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580