রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

মুজিবের উপস্থিতি লন্ডনের জন্যও মর্যাদার ছিল

অনলাইন ডেক্স :
  • প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৬৬ পাঠক পড়েছে

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে লন্ডনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রথম কার্যদিবসটিসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার করেন বাঙালীর নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। উপস্থিতি স্বল্প সময়ের হলেও, ইংল্যান্ডসহ পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি আদায়ে এটি ছিল প্রথম ও জোরালো পদক্ষেপ। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও উন্নত ব্যক্তিত্বের কারণে মুজিবকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল ইংল্যান্ডের সরকার এবং জনগণ।

সে সময় লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত পত্রিকাগুলোর সংবাদ ও সম্পাদকীয় থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায়। সম্প্রতি সশরীরে লন্ডনে গিয়ে দুর্লভ এসব পত্রিকা সংগ্রহ করেন লেখক-গবেষক ড. জালাল ফিরোজ। চলমান গবেষণার মধ্যেই কিছু বিখ্যাত পত্রিকার কপি এ প্রতিবেদককে দেখার সুযোগ করে দেন তিনি। পত্রিকাগুলো থেকে লন্ডনকেন্দ্রিক অজানা অনেক চমকপ্রদ তথ্য এবং ভবিষ্যত গবেষণার মূল্যবান উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।

পত্রিকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ থেকে জানা যায়, লন্ডনে মুজিবের উপস্থিতিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল স্থানীয় গণমাধ্যম। নিয়মিতভাবে নানা সংবাদ প্রকাশ করে আসছিল তারা। স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখা মুজিবের ওই সময়ের রাজনীতি কূটনীতি ও দেশী-বিদেশী চ্যালেঞ্জগুলোকে চিহ্নিত করে।

লন্ডনে পৌঁছার পরদিন ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বড় খবর ছিল মুজিবের আগমন। সদ্য স্বাধীন দেশের নেতা নিজের সময়টুকু কিভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

লন্ডনে পৌঁছার পরদিন ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বড় খবর ছিল মুজিবের আগমন। সদ্য স্বাধীন দেশের নেতা সময়টুকু কিভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন, পাওয়া যায় সে ধারণাও। প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমসের সংবাদে বলা হয়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান ব্রিটেন কর্তৃক বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দানের বিষয়টি উত্থাপন করেন।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী (হিথ) ইতিবাচক ও বন্ধুতার মনোভাব প্রকাশ করেই বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার পূর্বে নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকারকে নিশ্চিত হতে হবে, বাংলাদেশে নতুন সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন রয়েছে।

ড. জালাল ফিরোজ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এর পরপরই তরিৎ সিদ্ধান্তে ভারতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দিন তারিখ এগিয়ে আনার আহ্বান জানান শেখ মুজিব। দেশের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফলে আর কোন প্রশ্ন থাকে না।

আরও একটি সাক্ষাত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবের গুরুত্বকে তুলে ধরে। পত্রিকাটি জানায়, ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা হ্যারল্ড উইলসন ক্লারিজেসও হোটেলে গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে ৩০ মিনিটব্যাপী সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। কমনওয়েলথের মহাসচিব আর্নল্ড স্মিথও শেখ মুজিবের সঙ্গে ক্লারিজেস হোটেলে সাক্ষাত করেন।

এদিকে, একই সময় বাংলাদেশে প্রিয় নেতাকে বরণ করে নেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল বাঙালী। চলছিল বিপুল প্রস্তুতি। সেসব খবরও গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে থাকে লন্ডনের সংবাদপত্র। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি দি সানডে টাইমস ‘মুজিবকে বরণ করতে আজ ঢাকা প্রস্তুত’ শিরোনামে একটি সংবাদ পরিবেশন করে। ঢাকা থেকে ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থের পাঠানো রিপোর্টে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিমানবন্দর থেকে যে রাস্তা দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে যাবেন সেটির স্থানে স্থানে বিজয় তোরণ স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, রেসকোর্সে তিনি তাঁর প্রিয় দশ লক্ষাধিক স্বদেশবাসীর সামনে ভাষণ দেবেন।

সংবাদটি থেকে জানা যায়, দেশের মাটিতে জাতির জনককে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সরকারের বাইরে সাধারণ মানুষ নিজ থেকেও নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটি বিকেলে গড়ায়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সরকারীভাবে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিলেও, বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন নেতার নিরাপত্তার বিষয়টিকে। প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সংবাদে বলা হয়, একটি গার্ড অব অনার ছাড়া বাকি সব জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দিক থেকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী জনতার সংখ্যা ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ওপর গভীর দৃষ্টি রাখা হবে। সমর্থকদের বাঁধভাঙ্গা আবেগ ও সীমাহীন উল্লাসের মধ্যে শেখ মুজিবকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তি ফৌজের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয় সংবাদে।

শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংবাদ ১১ জানুয়ারি প্রকাশ করে লন্ডনের বিখ্যাত সংবাদপত্র দি এক্সপ্রেস। সংবাদটি লিড করার পাশাপাশি পত্রিকার প্রথম পাতার উপরিভাগের বড় অংশজুড়ে ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিতে আসা জনতার উচ্ছ্বাস ‘ম্যাড ফর মুজিব’ শিরোনামে প্রকাশ করে পত্রিকাটি। যুক্ত করা হয় বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত আবেঘন একটি ছবিও।

মুহূর্তটা শেষতক কতটা বাঁধভাঙা আবেগের ছিল তার একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় সংবাদে। বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বদেশে, আনন্দ-উন্মত্ত জনতার মধ্যে আজ ফিরে এলেন। তাঁদের নায়কের ফিরে আসার মুহূর্তে, যখন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট মাটি স্পর্শ করল, সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নিজেদের সুশৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে পারেননি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই প্রথম একটি জেট বাংলার মাটিতে অবতরণ করল। বাঙালীরা বাংলাদেশের জনককে স্বাগত জানাতে বিমানের চারপাশে সমবেত হলে তাঁর সিঁড়ি থেকে নামতেই পাঁচ মিনিট সময় লাগে। নেতাকে কাছে পেয়ে তাঁর গলায় পরানো হলো বিজয়মাল্য আর পায়ে ছিটানো হলো অসংখ্য গাঁদাফুল। সবাইকে পাশ কেটে এক সময় তাঁর কাছে গেলেন বয়স্ক পিতা, তরুণ মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁর পুত্র কামাল, যিনি নিজে মুক্তিবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট।

রাস্তার বর্ণনা দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, উন্মুক্ত ট্রাকে শেখ মুজিব যখন ঢাকা শহরে প্রবেশ করছিলেন তখন লাখ লাখ লোক রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। লাখো মানুষ যখন গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’, ‘শেখ মুজিব দীর্ঘজীবী হোন’ ইত্যাদি স্লোগানে শম্বুকগতিতে অগ্রসর হচ্ছিল তখন পুরো শহর স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

একেবারে প্রথমবারের মতো একটি তথ্য দিয়ে এখানে বলা হয়, নেতাকে স্বাগত জানাতে আসা জনতার চাপে অন্তত একজন নিহত ও অনেকে আহত হয়। শেষ পর্যন্ত ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছে শেখ মুজিব জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন।

সমস্ত কিছু অনুসরণ শেষে রিপোর্টে স্বীকার করে নিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিব লন্ডন ও দিল্লী হয়ে যখন দেশে ফিরলেন, বলা যেতে পারে, প্রকৃতপক্ষে আজ একটি নতুন জাতির জন্ম হয়েছে।

অবশ্য শুধু আনন্দ-উল্লাসের খবর নয়, বিদেশী সাংবাদিকরা মুজিবের ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জগুলোও তখনই তুলে ধরার প্রয়াস গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুকে তাদের মতো করে সতর্ক করে দিয়ে রিপোর্ট ও সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। দি সানডে টাইমস’র ৯ জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর চ্যালেঞ্জগুলো কেমন হবে সে সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান উদ্যাপন শেষ হওয়ার পর ‘গবর্নমেন্ট হাউস’-এ রাষ্ট্রপতির চেয়ারে তিনি যখন বসবেন তখন তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর ওপর অনেক ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চাপ আসবে। যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তিনি সফলতার সঙ্গে দিয়েছেন সেটি আসলে একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। এতে একদিকে যেমন আছেন মধ্য-বাম-সমাজতন্ত্রী, তেমনি আছেন রক্ষণশীল ডানপন্থীরা। পাকিস্তানের কূটনৈতিক মিশনের চাকরি পরিত্যাগ করে যারা প্রবাসে বাংলাদেশের জন্য কাজ করেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেসব বাঙালী কর্মকর্তা বিদ্রোহ করেছেন এবং সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন তারা এখন নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ সব পদে আসীন হতে চাইবেন। আশা পূরণ না হলে অনেকে নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হবেন।

একইভাবে উল্লেখ করা হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির কথা। সংবাদে বলা হয়, মুজিব যখন দায়িত্ব নেবেন তখন সরকারের তহবিল থাকবে শূন্য, বৈদেশিক মুদ্রার কোন রিজার্ভ থাকবে না এবং নিজের মুদ্রা ও মুদ্রাশক্তি বলতে কোন সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই। আগামী কয়েক মাস সেনাবাহিনী ও পুলিশকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার জন্য তাঁকে ভারতের ওপর নির্ভর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আশু করণীয় হলো আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং মুক্তিফৌজ ও অন্য সশস্ত্র গেরিলা দল ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি সামনে এনে বলা হয়, কিছু এলাকায় মুক্তিফৌজের নেতারা স্থানীয়ভাবে যুদ্ধনেতাতে পরিণত হয়েছেন এবং তাজউদ্দীনের সরকারের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকার করছেন। সরকারের কথায় তাঁরা কোন কর্ণপাত করছেন না।

দি এক্সপ্রেসের সংবাদে বলা হয়, যখন আনন্দের উচ্ছ্বাস শেষ হবে, শেখ মুজিবকে তখন অনেক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর নতুন দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর একটি। মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৩০ ডলারেরও কম।

প্রায় একই সময় ইংল্যান্ডের পত্রিকাগুলো বিভিন্ন সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ১০ জানুয়ারি লন্ডনের বিখ্যাত সংবাদপত্র দি ডেইলি টেলিগ্রাফ ‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। তাতে মুজিবের সফর ব্রিটেনের জন্যও বিশেষ মর্যাদার ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। সংবাদে বলা হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে যাওয়ার পূর্বে ব্রিটেনে এসে শেখ মুজিবুর রহমান বড় ধরনের সৌজন্য প্রদর্শন করেছেন।

শেখ মুজিবের সফরের উদ্দেশ্যটি বিষদে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয় সম্পাদকীয়তে। বলা হয়, মুজিব এসেছিলেন স্বীকৃতি পেতে এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে শক্তিশালী ভারতের বিপরীতে শক্তির ভারসাম্য স্থাপন করতে। তিনি সরাসরি নয়াদিল্লী যেতে পারতেন, নিজের দেশে ফেরার জন্য এটাই ছিল তাঁর সামনে একমাত্র পথ। কিন্তু শেখ মুজিবের জন্য তা ভাল দেখাত না। পূর্বে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল সেটির তুলনায় এখন যে তিনি রাজকীয় বিমান বাহিনীর বিমানে যাচ্ছেন, এটা তাঁর মতো জাতীয় নেতার মর্যাদার জন্য যথোপযুক্ত হয়েছে। মিসেস গান্ধী তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাফল্য তাঁর মুক্তি ত্বরান্বিত করেছে এবং সম্ভবত তাঁর জীবন রক্ষা করেছে।

পরের অংশের বলাটি আরও রিয়ালিস্টিক। সম্পাদকীয়তে বলা হয়, তবু শেখ মুজিব জানেন যে, এ ধরনের বন্ধুত্ব দু’ধারী তলোয়ারের মতো, যাকে খুব সাবধানতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হয়।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়কে ইংল্যান্ড প্রতিবন্ধক ভাবছিল, সেগুলোর কথাও বিস্তারিতভাবে এখানে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হিথ শেখ মুজিবের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন কী কী মানদ- বিবেচনা করে ব্রিটেন বিদেশী রাষ্ট্র ও সরকারগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের টিকে থাকার সামর্থ্য এবং সরকারের জনসমর্থন ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকতে হয়। বর্তমানে হবু-রাষ্ট্র বাংলাদেশ জননিরাপত্তা ও শান্তি শৃঙ্খলার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। শেখ মুজিব নিজ দেশের বাইরে এবং নয় মাস যাবৎ সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি এখনও এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি যে, ব্যাপক জনপ্রিয়তার মতো তাঁর কর্তৃত্বও কার্যকর। স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনায় তাঁর সামর্থ্য প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এখনও তাঁর সরকার ও প্রশাসন পরিচালনার সামর্থ্য প্রমাণিত হয়নি। এটা দেখা যাবে তাঁর ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর।

পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বঙ্গবন্ধু সরকারের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের কিছুটা বিরোধিতাও লক্ষ্য করা যায়। একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, গত শুক্রবারে ভাইস-প্রেসিডেন্ট [সৈয়দ] নজরুল ইসলাম ঘোষিত এক পরিকল্পনায় ব্যাংকিং, বীমা, বৈদেশিক বাণিজ্য ও অন্যান্য মৌলিক শিল্প জাতীয়করণের কথা বলা হয়েছে। যদি শেখ মুজিব বাস্তববাদী ও দূরদর্শী নেতা হন তাহলে তাঁকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে, বৈদেশিক সাহায্য তখনই আসবে যখন বিদেশী সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানো হবে। তাঁর আশু কাজ হবে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন এবং দেশে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

সব মিলিয়ে বহুবিধ সংবাদ, সম্পাদকীয়, আলোচনার নতুন দ্বার খুলে দেয় লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকা। সংবাদপত্রগুলো নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনার কাজ করছেন ড. জালাল ফিরোজ। এখন পর্যন্ত তার করা গবেষণা তুলে ধরে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বলতে বুঝি ১০ জানুয়ারি। ঢাকায় জনতার ঢল। এর বাইরে ভারতে অবস্থানের বিভিন্ন ঘটনার কথা ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু লন্ডনের বেলায় শুধু একটি সংবাদ সম্মেলনের কথাই জানা যায়। অথচ বলাই বাহুল্য এর বাইরে অনেক অজানা রয়ে গেছে। সে লক্ষ্যেই লন্ডনে গিয়ে সে সময়ের পত্রিকা সংগ্রহ করি আমি। কাজটি সহজ ছিল না। তবে দুর্লভ পত্রিকাগুলো হাতে পাওয়ার পর ভীষণ উৎফুল্ল হয়েছি। সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে যত গবেষণা করছি ততই অবাক হচ্ছি।

তিনি বলেন, লন্ডন সফরটি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সফর ছিল। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম কার্যদিবসটিও সেখানেই অতিবাহিত করেন তিনি। অনেকে এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। খুব যৌক্তিক কারণে আমি সে জায়গায় ফোকাস করেছি। পত্রিকাগুলোও আমার গুরুত্বের যৌক্তিকতাকে প্রমাণ করেছে।

ড. জালাল ফিরোজের লেখা গ্রন্থ প্রকাশের কাজ করছেন স্বনামধন্য কবি ও জার্নিম্যান’র প্রকাশক তারিক সুজাত। গবেষণাটি সম্পর্কে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো খুব বড় সোর্স। আমার জানা মতে, সোর্সটি অনেকেই খুঁজে নিতে পারেননি। জালাল ফিরোজ পেরেছেন। তার গবেষণায় এমন অনেক তথ্য সামনে আসবে যা আগে সামনে আসেনি। এর চেয়ে বড় কথা, বহুবিধ গবেষণার সুযোগ করে দেবে তার আজকের গবেষণা।

ড. জালাল ফিরোজও মনে করেন, নতুন নতুন গবেষণাকে উৎসাহিত করতে পারলেই তার শ্রম সার্থক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580