শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৮:৫৪ অপরাহ্ন

সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধাদের কথা

অনলাইন ডেক্স :
  • প্রকাশিত সময় : সোমবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২১
  • ২৮ পাঠক পড়েছে

বাইশ মাসের নুসরাত নুরাইয়াকে নিয়ে করোনার আতঙ্কের দিনগুলোতে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেছেন বাবা আজিজুল। জ্বর থাকায় কাক্সিক্ষত সেবা পাননি। অবশেষে লালমাটিয়ায় ই ব্লকের মসজিদ সমাজে ফ্রি স্বাস্থ্য সেবা এবং সেবার মানে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটি গত সেপ্টেম্বরের। একই এলাকায় অসংখ্য মানুষ সেবা নিয়েছেন সবই বিনামূল্যে। এলাকার জমির উদ্দিন, তাহের মিয়াও ফ্রি হেলথ ক্যাম্প থেকে ডাক্তারী পরামর্শসহ বিনামূল্যে কিছু ওষুধও পেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে করোনা শুরুর পর থেকে কয়েক মাস ভালভাবে অনেক সেবা পেতে কষ্ট হয়েছে খোদ হাসপাতালেও। সবার মধ্যেই নতুন রোগ করোনা নিয়ে একটা আতঙ্ক ছিল। আর সেই ভয়ের দিনগুলোতে মানুষদের সেবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসেন দেশের খ্যাতনামা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান ও তার টিম। পাড়া-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেন বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবাও ও ওষুধ। দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ডাক্তার রাশিদুল হাসান ও তার টিমের প্রতিটি সদস্যকে করোনাযোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেছেন সেবা পাওয়া মানুষগুলো।

জানা গেছে, নিজের বাড়িকেই হাসপাতালের মতো ব্যবহার করে করোনামুক্ত দেশ গড়ার কাজ করেন। রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিনামূল্যে দিয়েছেন ওষুধও। করোনার পরীক্ষাও বিনামূল্যে করিয়েছেন। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা জেনেভা ক্যাম্পেও বিনামূল্যে সেবা দেন তারা। ৪৩ হাজার বর্গফুট ক্যাম্পে জনসংখ্যা ৫০ হাজারের উপরে। সেখানে বসবাসরত মানুষদের সেবা দেয়ার লক্ষ্যে তিনটি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। ক্যাম্পের এসপিজিআরসি বুথে সেবা নেয়া মোঃ মহিউদ্দিন (৫৫) বলেন, এখানে টাকা ছাড়াই সেবা পেয়েছিলাম, এটা অবিশ্বাস ছিল। ওষুধও পাইছি টাকা ছাড়া। যেখানে ওই সময় আমরা কোথাও ডাক্তার পেতাম না হাসপাতালে রোগী দেখতে চাইত না। আর আমাদের মতো গরিবদের তো আরও বিপদ ছিল টাকাও নাই, সেবাও নাই। বিনামূল্যে সেবা পাওয়া নুরুদ্দিন খান বলেন, আমাদের ক্যাম্পে অনেক মানুষ করোনা আতঙ্ক তো অনেক ছিল আর সে সময় এই বিনামূল্যের সেবাটাও একটা বড় বিষয় ছিল।

জানা গেছে, প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ রাশিদুল হাসানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে করোনার মৃত্যুহার শূন্যে কমিয়ে আনতে যৌথভাবে ইনজিনিয়াস হেলথ কেয়ার ও সৌহার্দ্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘নিজ বাড়ি নিজ হাসপাতাল, করোনামুক্ত বাংলাদেশ’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিনামূল্যে করোনার পরীক্ষাসহ যে কোন ব্যক্তির অক্সিজেন সাপোর্ট দরকার হলে ২৪ ঘণ্টার জন্য অক্সিজেন সেবাও দেন। অক্সিজেন সেবাটি এখনও চালু আছে। নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক এই সেবা শুরু হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হয় এই স্বাস্থ্যসেবা। শ্যামলী রিং রোডে পালমো সেন্টারে দেখা গেছে, এখনও প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসছেন।

ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে জানা গেছে, মানুষদের সেবার লক্ষ্যে ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলায় ফ্রি স্বাস্থ্য ক্যাম্প করেন তারা। টিমে আরও ৫ চিকিৎসক কাজ করেন। ডাঃ মীর মাহবুবুল আলম, ডাঃ আরমান ফয়সাল, ডাঃ আব্দুলাহ-হেল-কাফি খান, ডাঃ মাহমুদ হাসান এবং ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন। ডাক্তারদের বাইরে এ ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে মেডিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট, স্বেচ্ছাসেবকসহ কাজ করেন আরও ২০ জনের একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল। মূলত করোনায় দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে একদিকে সুস্থতার হার বাড়বে আবার মৃত্যু হার কমে আসবে এমন চিন্তা মাথার নিয়ে করোনা মহামারীর দুর্যোগে মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করেন তারা।

গত জুলাই মাস থেকে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়ে নবেম্বর পর্যন্ত সেবা দেন। আর ডাঃ রাশিদুল হাসান এখনও চেম্বারে প্রতিনিয়ত রোগী দেখছেন। রোগী দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ডাঃ রাশিদুল হাসান জনকণ্ঠকে বলেছেন, করোনাকে ভয় পেলে চলবে না। ভয় আমিও পেয়েছিলাম তবে আমি সাবধান থেকেছি সবসবই। করোনা আগে থেকে চিহ্নিত করতে পারলে এবং তাকে ঠিকমতো চিকিৎসা করা হলে তার মৃত্যুঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন চ্যালেঞ্জ হবে এটাই পোস্ট কোভিড পেশেন্ট মেনেজমেন্ট’।

বিনামূল্যে সেবা দেয়ার প্রকল্পটি সেবাদান কার্যক্রম বিষয়ে জানা গেছে, এটি আগস্ট মাসের ৯ তারিখ থেকে শুরু হয় মোহাম্মদপুরের খিলজি রোড, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, বাবর রোড, হুমায়ুন রোড এবং লালমাটিয়ায় যা পরবর্তীতে জেনেভা ক্যাম্পেও সেবা দেয়া হয়। টিম আকারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবাদানের কাজ করা হয়। প্রতিটি টিমে আছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রতিনিধি মেডিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট, ও স্বেচ্ছাসেবকগণ কাজ করেন। মূলত এলাকাবাসীর মধ্যে প্রতিটি বাড়িতে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে করোনা উপসর্গ, ঠাণ্ডা-কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, খাবারের ঘ্রাণ না পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে খুঁজে বের করা হয় প্রাথমিক সন্দেহভাজন রোগীকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সেবা নিয়ে ডাঃ মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, করোনা শুরু থেকে কয়েক মাস একেকজন একেকভাবে যুদ্ধ করেছে। সামনাসামনি থেকে চিকিৎসা দিয়েছি এতে বুঝেছি যত দ্রুত চিকিৎসা দিলে সুস্থতার হার অনেক বেশি হয়। দ্রুত চিকিৎসার কারণেই অনেক মানুষ বেঁচে যাচ্ছেন। আর আমাদের উদ্দেশ্যে হলো সরকারসহ সমস্ত মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। দ্রুত চিকিৎসার বিষয়ে যাতে আমরা মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে পারি। আমরা রোগের হিস্ট্রি শুনে দ্রুতই তার এক্সরে করছি। যদি চেস্ট এক্সরেতে কোভিডের পক্ষে শ্যাডো পাওয়া যায় তবে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করছি। পাশাপাশি অন্যান্য পরীক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছি। আমরা মনে করি, শতকরা ৮২ জন মানুষের ফুসফুসে ভাইরাসটি নীরবে বিস্তার ঘটায় তাই এক্সরের সাহায্যে চিকিৎসাসেবা দ্রুত শুরু করতে পারছি।

জানা গেছে, এমন উদ্যোগের ফলে রোগীরা পেয়েছে বিনামূল্যে ডাক্তারী পরামর্শ এবং করোনা শনাক্তের সুবিধার্থে নানাবিধ ডায়াগনস্টিক টেস্ট যেমন বুকের এক্স-রে, সিবিসি, স্পাইরোমেট্রি, আরবিএস, অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল এবং ইসিজি। করোনার আরও সঠিক শনাক্তকরণের জন্য আইইডিসিআরের সহযোগিতায় বিনামূল্যে আরটিপিসিআর টেস্টও প্রদান করেছে। করোনা বা অন্যান্য যে কোন রোগের ক্ষেত্রে অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন হলে রোগীরা ঘরে বসেই ২৪ ঘণ্টার অক্সিজেন সেবা পেয়েছে বিনামূল্যে যা এখনও চলমান রয়েছে।

প্রকল্প কো-অর্ডিনেটর মোঃ রবিউল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের একটা লম্বা সময় চেষ্টা করেছি মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার। অনেক মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি ভাল লেগেছে। আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্টরা ঘরেই রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল, পালস রেট ও প্রেসার নির্ণয় করে তাদের নির্দিষ্ট সেন্টারে পাঠিয়েছেন যেখানে ডাক্তারসহ অপর মেডিক্যাল টিম কাজ করেন পরিপূর্ণ রোগের ইতিহাস, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে। কারো মধ্যে করোনা উপসর্গ পাওয়া গেলে করোনার সম্ভাব্যতা এবং রোগের তীব্রতা বা অবস্থা বোঝার জন্য করা হয় চেস্ট এক্সরে ও সিবিসি; যা করা হয়েছে বিনামূল্যে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন রোগীকে আইইডিসিআরের রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা আরটি-পিসিআরের ব্যবস্থা করা হয় রোগীর কোন খরচ ছাড়াই। জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় সর্দি-কাশির মতো সাধারণ রোগীর ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুই দিনের ওষুধ সরবরাহ করা হয় বিনামূল্যে। করোনা রোগীর ক্ষেত্রে অন্যান্য ওষুধের দুই দিনের ডোজের পাশাপাশি এ্যান্টিভাইরাল মেডিসিন হিসেবে ফেভিপিরাভিরের পূর্ণ ডোজ বিনামূল্যে দেয়া হয় যার মূল্যমান চৌদ্দ হাজার টাকা। পূর্ণ ডোজ সেবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৪৮ ঘণ্টার পরের ফলো আপ ভিজিট এবং সাতদিন পরের ফলো আপ ভিজিটে বাকি দিনগুলোর ওষুধ পুনঃ সরবরাহ করা হয়। মোঃ রবিউল আলম আরও বলেন, এছাড়াও কারও অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন হলে অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের মাধ্যমে প্রথম ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সেবা দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে প্রকল্প শেষ হলেও আমাদের অক্সিজেন সেবা এখনও চলমান।

গত আগস্টে রাজধানী থেকে শুরু হওয়া চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমটি দেশের ১৪টি জেলার মানুষের কাছে সেবা কার্যক্রম শেষে গত নবেম্বরে ইতি টানা হয়। এর মাধ্যমে সর্বমোট ২৮,১১৯ জনকে সেবা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে। যার মধ্যে ঢাকায় সেবাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৮,৫০৭ এবং ঢাকার বাইরে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে এই সেবাপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ৯,৬১২ জন যারা সাধারণভাবে তিনদিনের ওষুধ পেলেও কোথায় পেয়েছেন সাত, পনেরো, এক মাস এমনকি দুই মাসের ওষুধও দিয়েছেন কোন কোন গরিব ও দুস্থ রোগীকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
Design and Developed by DONET IT
SheraWeb.Com_2580